প্রাচীন মিশরের সবচেয়ে বিখ্যাত পিরামিড-মস্তাবাস।আজ মানুষের কেন এত আকর্ষন।

12

মস্তাবাস।

পিরামিডগুলি প্রাচীন মিশরের সবচেয়ে বিখ্যাত স্মৃতিস্তম্ভ যা আজকের দিনেও মানুষকে আকর্ষণ করে।

গিজার পিরামিড বা খুফুর গ্রেট পিরামিড মিশরের সব পিরামিডের মধ্যে বিখ্যাত,তা আমরা কমবেশী সবাই জানি।কিন্ত আমরা কি এটা জানি এই খুফুর পিরামিড প্রথম পিরামিড না যা প্রাচীন মিশরীয়দের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল।

পূর্ববর্তী মিশরীয় পিরামিড ৪,৬০০ বছর আগে তৃতীয় রাজবংশের প্রথম রাজা জোসের (ফারাও নেটজারিখাট) এর জন্য সাক্কারাতে নির্মিত হয়েছিলো।

যা জোসেরের নামে পরিচিত,জোসেরকে মিশরের দ্বিতীয় বংশের শেষ রাজা,খেসেখেমি এর পুত্র বলে মনে করা হয়।

তাঁর মা ছিলেন রাণী নিমাথাপ এবং তাঁর স্ত্রী রাণী হেটেপেরেপ্পতি,যিনি সম্ভবত তাঁর সৎবোন।এই পিরামিডের নকশা ও নির্মাণ করেন জোসের উজির ইমহোটেপ।জোসের প্রথম রাজা যিনি প্রস্তর দিয়ে প্রথম নির্মান কাজ শুরু করেন।

খুফু এবং জোসের পিরামিডের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য হলো এদের গঠন এবং আকৃতি।জোসের পিরামিড ছয় ধাপে গঠিত,এর জন্য একে সাক্কার ধাপ পিরামিড বলে।

ধাপ পিরামিডটি গত শতাব্দীতে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা এবং তদন্ত করে জানা গেছে যে ইমহোটেপ প্রথমে একটি সাধারণ মাস্তাবা কবর নির্মাণ শুরু করে যার উচ্চতা ছিলো ২০ ফুট (৬ মিটার)।

কিন্তু পরবর্তীতে ইমহোটেপ আরো উচু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো।অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে পিরামিডটি স্বাভাবিক আয়তক্ষেত্রাকার আকৃতির পরিবর্তে বর্গক্ষেত্রের এবং তারপর আবার আয়তক্ষেত্রাকার ইমহোটেপ কেন ঐতিহ্যগত আয়তক্ষেত্রাকার মস্তবার আকৃতির পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নেন তা অজানা।

মাস্তাবা নির্মানে চুনাপাথরের ব্লক ব্যবহার করা হয়েছে,এর আকার মাটি দিয়ে বানানো বড় ইটের অনুরূপ।

জোসের পিরামিডটির অনন্য আকৃতি দেখে প্রাচীন মিশরের ভবনের গঠন,আকৃতি ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।মিশর এর প্রথম এবং পুরাতন রাজত্বের সময় আয়তক্ষেত্রাকার কাঠামো তার উপরে বহির্মুখী ঢালযুক্ত সমতল ছাদ এই ধরনের কাঠামো সমাজের অভিজাত সদস্যদের সমাধি হিসাবে চিহ্নিত করার জন্য ব্যবহার করা হত।

মৃত্তিকা-ইট বা পাথরের তৈরি এই কাঠামোগুলি মস্তাবাস নামে পরিচিত ছিল (আরবিতে এর অর্থ ‘কাদা বেঞ্চ’)।জোসের পিরামিড এই ভাবে ছয়টি মস্তাবাস একটি অন্যটির উপরে রেখে নির্মান করা হয়েছে। সম্ভবত ধাপ পিরামিড নির্মাণ মিশরীয় রাজত্বের বিকাশের বিবর্তনের প্রতিফলন ছিল।

এই উদ্ভাবনের কারনে ধাপ পিরামিডটি সেই সময়ের সবচেয়ে লম্বা কাঠামো এবং একটি বিস্ময়কর স্থাপত্যে ছিল।প্রায় ৬২ মিটার উচু ধাপ পিরামিড সাক্কারা নেক্রোপোলিসে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে।

পিরামিডটি শুধুমাত্র মৃতদেহ রাখার স্থান ছিলো যেখানে ফারাওদের চিরস্থায়ী ভাবে রাখা হয় পুজাঅর্চনা করার জন্য।

এই পিরামিডটির ভিত্তি ১২১ মিটার এবং ১৫ হেক্টর এলাকা নিয়ে এই পিরামিডটি বিস্তৃত পার্শ্ববর্তী কমপ্লেক্সে পুরোহিতদের জন্য এখানে ৪০ একর এলাকার মধ্যে মন্দির, থাকার ঘর,আঙ্গিনা বানানো হয়েছিলো।

এর চারিদিকে ১০.৫ মিটার উচু টুরা চুনাপাথরের দেয়াল দিয়ে ঘেরা এখনো দেয়ালের কিছু অংশ দেখা যায়।

এই দেয়ালে ১৩ টি নকল দরজা বানানো হয়েছিলো এর মধ্যে একটি দরজা আসল আর তা দক্ষিন-পূর্ব কোনায় অবস্থিত।

চারিদিকের প্রাচীর ২৪৬০ ফুট দীর্ঘ এবং ১৩১ ফুট প্রশস্ত বৃত্তাকার পরিখা দিয়ে ঘেরা ছিলো।অবাঞ্ছিত মানুষ যাতে ভিতরে প্রবেশ করতে না পারে সেই জন্য এই ব্যবস্থা করা হয়েছিলো।

কেউ যদি অভ্যন্তরীন আঙ্গিনা এবং মন্দির পরিদর্শন করতে চায় তবে একজনের সাহায্যর প্রয়োজন হবে যে ভিতরে প্রবেশের রাস্তা চিনে।

এই পিরামিড এবং এর পার্শ্ববর্তী জটিল অত্যাশ্চর্য স্থাপনা নির্মান নিয়ে জোসের খুব গর্বিত ছিলো যার ফলে স্মৃতিস্তম্ভের উপর নিজের নাম মুছে ফেলে সেখানে ইমহোটেপের নাম খোদাই করে।

এই প্রবেশদ্বারটি দক্ষিনের চত্বরের সাথে সংযুক্ত যা স্তম্ভশ্রেনী মাধ্যমে আচ্ছাদিত। এই স্তম্ভগুলো চুনাপাথরের দিয়ে বানানো যা দেখতে গাছের ডালপালার অনুরূপ।

দক্ষিন চত্বরের বাকানো পাথরগুলি সিড উৎসবের সাথে যুক্ত সীমানা চিহ্নিতকারী বলে মনে করা হয়,যা ৩০ বছর ধরে রাজত্বের পর ফারাও কর্তৃক গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান করা হয়।

মন্দিরের প্রবেশদ্বার কাঠামোর উত্তর দিকে অবস্থিত পিরামিডের এই পাশে জোসের মৃত্যুর মন্দির অবস্থিত।এই মন্দিরে প্রতিদিন পূজাঅর্চনা করা হতো যাতে করে মৃত্যুর পরের জীবনে ফারাওরা যাতে ভালো থাকতে পারেন।

এই মন্দিরটি উত্তর দিকে মুখ করে আছে প্রাচীন মিশরীয়রা এটি বিশ্বাস করতো যে মৃত্যুর পরে ফারাও অনন্ত নক্ষত্র গুলির মধ্যে একটি হয়ে উঠবে।

ধাপ পিরামিড,উত্তর বাড়ি,দক্ষিন বাড়ি,হেব সিড কোর্ট, দক্ষিন সমাধি টি মন্দির,উত্তরাঞ্চলীয় সমাধি মন্দির, চারিদিকের প্রাচীর এই সব কিছু নিয়ে ধাপ পিরামিডটি একটি প্রাচীন মিশরীয় শহরের আকার ধারন করেছে।আর বাস্তবেও জোসের কমপ্লেক্স সেই সময় হিয়ারকানপোলিস শহরের চেয়েও বড় ছিল।

উত্তর এবং দক্ষিণের বাড়ি কি কারনে নির্মান করা হয়েছে তার কারন অজানা,তবে এটি অনুমান করা হয় যে তারা উচ্চ ও নিম্ন মিশরের প্রতিনিধিত্ব করেছিল।

সিরডাব পিরামিডের উত্তর প্রবেশদ্বারের কাছাকাছি একটি চুনাপাথর বাক্স যেখানে জোসের একটি বড় আকারের মূর্তি রাখা আছে এই মূর্তি মৃত্যু পরবর্তী রাজার আত্মার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

এর মধ্যে টি মন্দিরটি জটিল এবং সবচেয়ে রহস্যময় কাঠামো ভবনের বাইরের দিকটি সাদামাটা কোন কারুকার্য নেই কিন্তু ভিতরে অসাধারণ কারুকার্যময়,জুড স্তম্ভ দিয়ে নির্মিত যা স্থিতিশীলতার প্রতিনিধিত্ব করে।

এর ভিতরে দেয়ালে খোদাই করা অসাধারণ সব ভাস্কর্য রয়েছে,এর মধ্যে একটি অর্ধ খোলা দরজা রয়েছে যা দেখতে আসল দরজার মত মনে হয়।

কি কারনে এই দরজা খোদাই করা হয়েছে এর অর্থ স্পষ্ট নয়,তবে অনুমান পরকালের প্রতীকী প্যাসেজওয়ের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে।

উত্তর মৃত্যুর মন্দির এটি পিরামিডের কাছাকাছি উত্তর দিকে অবস্থিত মন্দিরটি পিরামিডের ভূগর্ভস্থ পথগুলিতে প্রবেশ করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল,যা কবরস্থানের চেম্বারে চলে আসে।

ভূগর্ভস্থ এই পথে সবচেয়ে রহস্যময় আবিষ্কার পাথর দিয়ে বানানো জাহাজ,এখানে বিভিন্ন আকার এবং আকৃতির ৪০,০০০ হাজার জাহাজ আছে।এই জাহাজগুলি পিরামিডের ভিতরে ৬ষ্ঠ এবং সপ্তম খাদে সুন্দর করে সাজানো।

এই জাহাজগুলিতে মিসরের প্রথম ও দ্বিতীয় রাজবংশের শাসকদের নাম লিপিবদ্ধ করা আছে যেমন রাজা নর্মার জের দেন,আদিজিব,
সেমেরখেট,কহিটারপসেহেমি,নিনিতজার,
সেখেমিব এবং খেসেখেমিয়ের নামগুলি খোদাই করা আছে।

এর পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত ব্যক্তিদের (অ-রাজকীয়) নামগুলিও লিপিবদ্ধ করা আছে।এই জাহাজগুলি বিভিন্ন ধরনের পাথর যেমন ডায়োরাইট চুনাপাথর আলবাস্টার সিলস্টোন এবং স্লেট দিয়ে বানানো।

জাহাজগুলি কেন স্থাপন করা হয়েছিল তা নিয়ে পণ্ডিত ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্যে মতবিরোধ আছে।

প্রত্নতাত্ত্বিক লাউর,যিনি সর্বাধিক খনন কাজের সাথে জড়িত তার মতে দ্বিতীয় রাজবংশের শেষের দিকে খেসেখেমি দ্বারা এটি সংরক্ষণ করা হয়েছিল তাকে এবং তার পূর্বপুরুষদের সম্মান করার জন্য পিরামিডের ভিতরে জোসরকে যথাযথ সমাধি দেওয়া হয়েছিল।

অন্যান্য ঐতিহাসিকরা অবশ্য দাবি করেছেন যে জাহাজগুলি খাদের ভিতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল,যাতে করে কবরস্থানে ডাকাত প্রবেশ করে কোন কিছু চুরি করতে না পারে।

এত সতর্কতা এবং জটিল নকশার পরেও ডাকাতদের আটকে রাখা যায়নি কবরে রাখা মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক সামগ্রী এমনকি সেই সাথে জোসেরের মমিও অতীতে কোনও সময়ে চুরি হয়ে গিয়েছিল।

এই ধাপ পিরামিড অনেক ঘাত প্রতিঘাতের পরেও সাড়ে চার হাজার বছরেরও বেশী সময় ধরে দাঁড়িয়ে আছে।গত দশ বছর ধরে,এই প্রাচীন কাঠামো পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে।

আর এই উদ্ধার প্রচেস্টা নিয়েও প্রচুর সমালোচনা হয়েছে সমালোচকদের মতে,পুনরূদ্ধার কাজটি পিরামিডের বাহিরে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত করেছে।

উপরন্তু এটি দাবি করা হয়েছে যে ভিতরে কাজ করার ফলে স্মৃতিস্তম্ভ গুলোও ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে।

এই দাবি মিশরীয় কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করেছে,এবং তারা পিরামিড পুনরুদ্ধারের কাজ চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যাক্ত করেছে।

সুত্র ছবিঃএনসিয়েন্ট হিস্টোরি,এনসিয়েন্ট অরিজিনস, লাইভ সায়েন্স,এনসিয়েন্ট ইজিপ্ট।
লেখকঃনেবুলা মোর্শেদ ।