আধ্যাত্মিক সাধকের নির্মিত কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদ ইতিহাস।

38

এই প্রাচীণতম মসজিদটি ১৮২০ সালে কিশোরগঞ্জ শহরের নরসুন্দা নদীঘেষে নির্মিত হয়েছিল। হয়বতনগর দেওয়ান বাড়ির দেওয়ান জেলকদর খানের হোজরাখানাকে কেন্দ্র করে প্রথমে তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ এবং মসজিদের পাশেই খানকা নির্মাণ করেছিলেন দেওয়ান জেলকদর খানের পুত্র দেওয়ান শানেওয়াজ খান। ইতিহাস থেকে জানা যায়, দেওয়ান জেলকদর খানের পূর্বপুরুষ বাংলার প্রাণপুরুষ ঈসা খাঁ মসনদ-ই-আলার ষষ্ঠ অধস্তন দেওয়ান হয়বত খান ১৭৩০-১৭৩৫ সালের দিকে জঙ্গলবাড়ি থেকে হয়বতনগরে এসে চতুর্দিকে সুউচ্চ দেয়াল দ্বারা বেষ্টিত বিশাল হাবেলি নির্মাণ করেন এবং তার নিজ নামেই স্থানটির নামকরণ করেন হয়বতনগর।

জনশ্রুতি রয়েছে, ঈসা খাঁ মসনদ-ই-আলার অধস্তনদের মধ্যে প্রতি একশ বছরে একজনকে কামালিয়াত প্রদান করে থাকেন হযরত খিজির (আ)। এরই ধারাবাহিকতায় এ সময় ঈসা খাঁর অষ্টম অধস্তন এবং হয়বত খানের তৃতীয় অধস্তন দেওয়ান মাসুম খানের কনিষ্ঠ পুত্র দেওয়ান জেলকদর হযরত খিজির (আ)-এর সাক্ষাৎ পান এবং পরবর্তীকালে একজন উঁচুদরের আধ্যাত্মিক সাধক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। এছাড়া তিনি পাগলা সাহেব নামেও বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন। তিনি কামালিয়ত হাসেল করার পর জমিদারি পরিত্যাগ করে এই স্থানেই অবস্থান করেন এবং ইবাদতে মশগুল হয়ে পড়েন। এখানেই নির্মাণ করেন খানকা ও মসজিদ।

হযরত জেলকদর খানের হুজরাকে কেন্দ্র করে এই স্থানে নির্মাণ করা হয়েছিল তিন গম্বুুজবিশিষ্ট মসজিদ। মসজিদটি বিগত শতকের প্রথম দিকে অনেকেই প্রত্যক্ষ করেছেন। মসজিদটি নির্মাণে পাথরের লিন্টেলসহ পাথরের স্তম্ভ উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। বিগত শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত পাথরগুলো বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখেছেন এলাকার লোকজন। ১৯২৬ সনের ভয়াবহ বন্যায় তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি ভেঙে যায়। মসজিদ নির্মাণের পাথরের উপকরণগুলো এই স্থান থেকে অপসারিত না হওয়ায় পাথরগুলোকে কেন্দ্র করে এক ধরনের শিন্নি মানত হতে থাকে। পাথরগুলোতে দুধ ঢেলে মানত করার রেওয়াজ ছিল।

হযরত জেলকদর খান ছিলেন আধ্যাত্মিক সাধক পুরুষ। উপমহাদেশে প্রচলিত বিভিন্ন তরিকাভিত্তিক সুফি সাধনার বিষয়বস্তু পর্যালোচনা করলে অনুধাবন করা যায় যে, কোনো কোনো সুফি তরিকায় ৪০ দিন, ৮০ দিন এবং ৬ মাসের জন্য নদীর উপর অথবা নদীর তীরে নির্জনে চিল্লাকশী করার নিয়ম রয়েছে। ফলে হযরত দেওয়ান জেলকদর খান নদীর তীরে এই নির্জন স্থানটিকেই বেছে নিয়েছিলেন।

পাগলা মসজিদ নিয়ে আরও একটি ধারণা প্রচলিত আছে। একটি জনশ্রুতি হচ্ছে, যে একজন আধ্যাতিক পুরুষ নরসুন্দার প্রবল জল¯্তে মাদুর পেতে ভেসে আসেন। নদীর মধ্যবর্তী স্থানে তিনি স্থিত হন এবং এভাবেই কয়েকদিন কেটে যায়। তিনি ধ্যানমগ্ন থাকাবস্থয় ধীরে ধীরে নদীর সেই স্থানটিতে চর জেগে ওঠে। জেলেরা মাছ ধরতে এসে এই অলৌকিক দৃশ্য দেখে তারা অবাক ও বিস্মিত হয়ে যায়। কিন্তু সাহস করে কেউ তাঁর কাছে যায় নাই।

এরই মধ্যে নদীর বিপরীত দিকে অবস্থিত রাখুয়াইল গ্রামের জনৈক গোয়ালা ধেখতে পায়, তার সদ্য প্রসবিনী গাভীর ওলানে কোনো দুধ আসছে না। সে আরো দেখে গাভীটি পাল থেকে বেরিয়ে নদী সাঁতরিয়ে সেই আধ্যাত্মিক সাধকের চরায় উঠে যায় এবং সাধকের পাশে রক্ষিত একটি পাত্রে ওলানের দুধ ঢেলে দিয়ে গাভীটি আবার নদী সাঁতরিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। গাভীর ক’দিন ধরে একই ধরণের ঘটনা ও আশা-যাওয়া দেখে গোয়ালা নিশ্চিত হয় যে, সাধক একজন কামেল পুরুষ এতে কোনো সন্দেহ নাই। এধরণের কামালিয়াত দেখে গোয়ালা সাধকের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে এবং কিছুদিনের মধ্যেই গোয়ালার সংসারে প্রভুত উন্নতি ঘটে।

গোয়ালার উন্নতি দেখে স্থানীয় অন্যান্য জেলে-তাঁতীসহ অনেকেই সাধকের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে। পরে শিষ্যদের মাধ্যমেই এখানে সাধকের হোজরাখানা গড়ে তোলা হয়। সাধকের মৃত্যুর পর তাঁকে হোজরাখানার পাশেই কবর দেয়া হয়। পরে হোজরাখানার পাশেই একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে পাগলা সাধকের নামানুসারে পাগলা মসজিদ হিসাবে এটি খ্যাতি পায়।

বর্তমান দৃষ্টিনন্দন পাগলা মসজিদটি একসময় ছিল একটি টিনের চৌচালা ঘর। সেখানে একটি উঁচু টিলার ওপর ছিল একটি ৪-৫ হাত দীর্ঘ পাথর। এর মাঝখানে ছিল খানজকাটা। এছাড়াও ছিল বেশ কয়েকটি ইট। এই পাথর ও ইটকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে প্রচলিত ছিল বেশ কিছু লোকাচার। কুমারীরা উপযুক্ত বর কামনায় ও নারীরা সন্তানের আশায় পাথরটির খানজে উপাচারসহ সিঁদুর রঞ্জিত করত। আবার অনেকেই মামলা-মোকদ্দমা অথবা কারও ক্ষতি কামনায় ইটগুলো উল্টে দিত। বর্তমানে মসজিদ প্রাঙ্গণে সেই পাথর নেই, নেই ওসব ইটও। তবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পাগলা মসজিদের প্রতি ভক্তি ও বিশ্বাস এখনও অটুট রয়েছে। ফলে শিরনি মানত এবং দান-খয়রাতের পরিমাণ দিন-দিন বেড়েই চলেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্থ খেকে এখনও ছুটে আসছেন নানা বাসনা-কামনায় অগনিত মানুষ।

বর্তমানে মসজিদটি জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে একটি পরিচালনা কমিটি কর্তৃক পরিচালনা করা হচ্ছে। মসজিদের আগের অবয়ব অনেকটাই পরিবর্তন করে একে আরো আকর্ষনীয় ও দৃষ্টিনন্দন করা হয়েছে। মুসুল্লিদের সুবিধা বৃদ্ধিসহ এর পরিধি বাড়ানো হয়েছে। সুন্দর মসজিদটি এখন আরো অপরূপ ও সুন্দর হওয়ায় দেশের দূর দূরান্ত থেকে আগ্রহী পর্যটক এখানে ভিড় করছেন। তারা অকাতরে মসজিদে দান-খয়রাত করছেন। মসজিদের সিন্দুক প্রতি তিনমাস অন্তর খোলা হয়। এতে দেখা যায় প্রতিবারই কোটি টাকার বেশি দানের অর্থ ও সোনা-দানা পাওয়া যায়। প্রচুর অর্থ প্রাপ্তির ফলে মসজিদটিকে একটি মডেল মসজিদরূপে প্রতিষ্ঠিত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সত্যিকার অর্থে পাগলা মসজিদটি এতদঞ্চলের একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন ও গৌরবের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

ছবি ও তথ্য সুত্র- সংগ্রহীত