গল্প এক প্রতিবাদী কন্যা-জীবনের গল্প তুলে আনাহল।

20

গল্প

লেখকঃবুননে কামরুজ্জামান স্বাধীন

শিরোনাম প্রতিবাদীকন্যা।

#তারিখঃ ০৫.০৮.২০২০

“আম্মু আমরা দুইটা গরু কোরবানী দিলাম, আব্বু এত টাকা কোথায় পেল?” মায়ের সাথে গরুর মাংস ফ্রিজে রাখার কাজ করতে করতে ১৭/১৮ বছরের মেয়ে জিনিয়া উদ্দেশ্য বিহীন ভাবেই মায়ের কাছে জানতে চায়।

মিসেস সালেহা বেগম মাংস পলিথিনে ভরার কাজে ব্যস্ত ছিলেন, মেয়ের কথা শুনেও খেয়াল না করার মত চুপ করে আছেন। জিনিয়া মায়ের দিক থেকে দ্রুত উত্তর প্রত্যাশা করেছিল কিন্ত না পেয়ে হতাশ হয়ে মায়ের দিকে তাকায়।

“আম্মু আমি একটা কথা জানতে চেয়েছি।” জানার প্রবল আগ্রহ থেকে রিপিট করে। “তুই যেন কি জানতে চেয়েছিস?” মিসেস সালেহা বেগমের উল্টো প্রশ্নে জিনিয়া হতবাক।

“তুমি আমার কথা শুনতে পাওনি! আম্মু তোমার অতি দ্রুত কানের ডাক্তার দেখানো উচিত।” ফ্রিজে আরেকটা প্যাকেট রাখতে রাখতে বলে।

সালেহা বেগম শুনতে পেয়েছেন কিন্তু মেয়ের প্রশ্নের উত্তরে কি বলবেন সেটা ভেবে পাচ্ছেন না। মনে মনে ভাবেন ছেলে মেয়েকে কি করে তাদের বাবার উপরি ইনকামের কথা বলেন। “আম্মু, আব্বু আর জামাল আংকেল একই অফিসে জব করেন। পজিশনও এক, জামাল আংকেল দিলেন একটা ছাগল আর আব্বু দুইটা গরু, তাও আবার বড় বড় গরু! ঠিক বুঝলাম না।” জিনিয়া গোয়েন্দাদের মতো অজানা রহস্য উদঘাটনে নেমেছে। নাছোড়বান্দা মেয়ে যেন মায়ের কাছ থেকে রহস্য উন্মোচন করেই ছাড়বে।

“দেখ মা, সবাই একই অফিসে, একই ডেজিগনেশনে থাকলেও ইনকাম এক না। কারো কারো উপরি ইনকাম থাকে। তোমার আব্বুর উপরি ইনকাম বেশী।” সালেহা বেগম গতান্তর না দেখে কোনো রকমে বুঝ দেবার চেষ্টা করলেন।

“আম্মু, উপরি মানে তো ঘুষ! আব্বু ঘুষ খায়! ঘুষের টাকায় কোরবানী! তাহলে তো আমাদের কোরবানী হয়নি। হালাল উপার্জন ছাড়া তো কোরবানী হবে না বলেই পড়েছি এবং জেনেছি।” জিনিয়া বেশ হতাশ হয় এবং জিনিয়ার চেহারায় অসন্তুষ্টের কালো ছায়া দেখা যায়। জিনিয়া আর কিছু না বলে মাংস রেখে নিজের রুমে চলে যায়। “কিরে কি হলো? মাংস গুলো না রেখে যাচ্ছিস কোথায়?” সালেহা বেগম মেয়ের পিছু ডাকতে থাকেন। জিনিয়া পিছু ডাকেও থামে না।

সালেহা বেগম মেয়ের আচরণে ব্যথিত হন। মাংস রেখে হাত মুছে মেয়ের পিছু নেন। জিনিয়া রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। সালেহা বেগম চিন্তিত হয়ে পড়েন। হঠাৎ মেয়ের এহেন প্রতিবাদী আচরণে ভাবনায় পরে যান। মেয়ের দরজায় নক করে বেশ কয়েক বার ডাকেন কিন্তু জিনিয়া রেসপন্স করে না।

“এসি রুমে থাকতে, গাড়িতে চড়তে আর ভালো ভালো জামা কাপড় পড়ার সময় হারাম হালাল খেয়াল থাকে না। কোরবানীর গরুর ক্ষেত্রে সব খেয়াল।” একটু রাগান্বিত হয়েই বলেন। কিছুটা বিমর্ষ বদনে কিচেনে ফেরার জন্য ঘুরতেই জিনিয়া দরজা খোলে দাঁড়ায়। দরজা খোলার শব্দে সালেহা বেগম থেমে যান। “আম্মু, আব্বুকে বলে দিও আমরা কষ্টে থাকবো, জামাল আংকেলের মত সাদামাটা জীবন যাপন করবো, কিন্তু মানুষের মুখে আব্বু ঘুষ খায় শুনতে পারবো না। টিভিতে একজন ঘুষখোর ও দুর্নীতিবাজ হিসেবে বাবার ফুটেজ দেখতে পারবো না। আম্মু, আব্বুকে এই পথ থেকে সরে আসার জন্য প্লিজ অনুরোধ করো।” জিনিয়া বলেই কাঁদতে কাঁদতে দরজা বন্ধ করে দেয়।

সালেহা বেগম মানসিক ভাবে প্রচন্ড হোঁচট খান। বিষণ্ণ মনে ভাবেন, যেই ছেলে মেয়ের ভবিষ্যত ভেবে উপরি আয়ের চেষ্টা করে সেই ছেলে মেয়ে এটা পছন্দ করে না। তাহলে কেন এই অহেতুক উপরি! এইসব ভেবে নিজেও বিষণ্ণ হয়ে পড়েন। অন্যায়কে প্রশ্রয় দেবার অপরাধে নিজেও অপরাধ বোধে ভোগতে থাকেন।

সালেহা বেগমের চোখের কোণে নোনা জল জমে, হাত পা যেন অবস হয়ে আসছে, চলতে চায় না। মেয়ের রুম থেকে কিচেন এইটুকু পথ হাঁটারও যেন শক্তি নেই। আঁচলে চোখ মুছে পা বাড়ায় কিন্ত মনে হয় পা যেন কেউ জোড় করে চেপে ধরে রাখছে। মেয়ের একটু প্রতিবাদেই মনের এই অবস্থা, টিভিতে, নিউজ পত্রিকায় ছবিসহ ঘুষখোর স্বামী আহাদ সাহেবের ছবি ছাপা হলে তখন কি করবেন?

রাতের খাবার খেয়ে সালেহা বেগম ঘুমাবেন মনে করে খাটে শুয়ে আছেন। ঈদের দিন অথচ স্বামীর সাথে বসে না খেয়ে একা একা খেয়ে এসে শুয়ে আছেন।

আহাদ সাহেব নিজ থেকেই টেবিলে রাখা খাবার খেয়ে নেন। গরুর মাংস দিয়ে মুড়ি, এটাই যেন কোরবানী ঈদের জন্য উত্তম খাবার। খাওয়া শেষ করে শো’বার রুমে ঢুকেন। স্ত্রীকে উপুর হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে একটু অবাক হন। কাছে এসে কপালে হাত দিতে গিয়ে থেমে যান। এরপর ভাবেন সারাদিন অনেক ধকল গেছে তাই হয়তো বিশ্রাম নিচ্ছে।

আহাদ সাহেব ধীরস্থির ভাবে খাটে উঠার জন্য এক পা তুলতেই সালেহা বেগম ঘুরে যান। স্বামীকে দেখে সোজা উঠে বসেন। বড় বড় অগ্নি চোখে স্বামীর দিকে তাকান। আহাদ সাহেব স্ত্রীর এই অগ্নিরুপ এর অর্থ খুঁজে পান না। পাশে বসেন, আরও ভাল করে খেয়াল করেন। সালেহার চোখ লাল। তার মানে কান্না করেছে। দূইটা বড় বড় গরু কোরবানী দেবার পরও স্ত্রীর মন বিষণ্ণ! একটু অবাক হন। কারণ জানার জন্য ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে যান কিন্তু প্রকাশ করেন না। “তোমার মন খারাপের কারণ জানতে পারি?” আহাদ সাহেব জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকান। উত্তরের অপেক্ষা করেন।

“তোমার মেয়ে হারাম টাকার কোরবানীর মাংস ছুঁবে না বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।” বেশ স্বাভাবিক ভাবে তবে একটু নিচু গলায় বলেন। আহাদ সাহেব কথাটা শুনে যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না। তাঁর ডিমান্ডিং মেয়ে একথা বলতে পারে! ভীষণ অবাক হোন। “হঠাৎ এই বিদ্রোহ কেন?” একটু বিস্ময় নিয়েই জিজ্ঞেস করেন। সালেহা বেগম কোন উত্তর না দিয়ে নির্বাক চোখে তাকিয়ে থাকেন। সুশ্রী অপরূপা স্ত্রীর মুখ যেন এখন ঠিক বর্ষার মেঘের শো-রুম। এখনই যেন ঝরঝর করে বৃষ্টি ঝরবে।

“জিনিয়া স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছে, একজন ঘুষখোর দুর্নীতিবাজ হিসেবে নিজের বাবার ছবি যেন কখনও নিউজ পেপারে বা টিভিতে দেখতে না হয়।” সালেহা বেগমের কন্ঠ জরিয়ে আসে। একটু থেমে দম নেন। আহাদ সাহেবের বাকরুদ্ধ অবস্থা। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। মেয়ের হঠাৎ বদলে যাওয়া নিয়ে চিন্তিত। “আসলে সরকার ও দুদক যে ভাবে ঘুষখোর ও দুর্নীতিবাজদের ধরে মামলা করছেন এবং মিডিয়া যে ভাবে এদের বিরুদ্ধে প্রচার করছে তাতে ছেলে মেয়েরা মান সম্মান নিয়ে শঙ্কিত। আমিও ইদানিং বেশ টেনশনে থাকি। আপনি একটু নিজের লোভের লাগাম টেনে ধরুন।” খুব সুন্দর ভাবে গুছিয়ে বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন।

আহাদ সাহেব বেশ মনোযোগ দিয়ে স্ত্রীর কথা শোনে একটু হতাশার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হালকা হন। “বেশ তোমরা যেহেতু চাচ্ছো না, তাহলে আমি কেন অন্যায় পথে ইনকাম করবো?”- স্ত্রীর দিকে তাকান। সালেহা বেগম এর দৃষ্টিতে এখনও দ্বিধা দ্বন্দ্ব। “আমার বেতনের টাকা দিয়ে পারবে তো এই চাকচিক্যময় দৈনন্দিন জীবন অতিবাহিত করতে?” স্ত্রীর দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়।

“ওরা জামাল সাহেবের মতো সাদামাটা জীবন যাপনের জন্য প্রস্তুত। কষ্ট করবে তবুও তোমার সম্মান হানি হয় এমন কোনো কিছু সহ্য করতে পারবে না। ওরা তোমাকে অপরাধী হিসেবে সমাজের মানুষের সামনে দেখতে চায় না। ওরা চায় সবাই বলুক ওদের বাবা সৎ, যেমনটা জামাল সাহেবকে সবাই বলে।” সালেহা বেগম স্বামীর চোখের দিকে তাকিয়েই বলেন। এই বলতে পারাতে কোন অন্যায় বা অপরাধ দেখছেন না। বরং ভিতরে একটা শান্তির ঝর্ণা প্রবাহ অনুভব করতে পারছেন।

আহাদ সাহেব আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়েন। চোখ বন্ধ করলেও ঘুমের কোনো লক্ষণ নেই। চোখ বন্ধ অবস্থায় নিজের কুকর্ম নিয়ে চিন্তা করেন। দুইটা বাড়ি আর তিনটা ফ্ল্যাট কিনেছেন এই নিয়ে ভাবেন। চিন্তা করেন বেতন দিয়ে তো ছেলে মেযের লেখাপড়ার খরচ হবে না, খাবে কি। আবার জামাল সাহেবের জীবন যাপন নিয়ে চিন্তা করেন। ভাবতে ভাবতেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়েন জানেন না।

“আমি আর ঘুষ খাবো না মা। এই কান ধরে প্রতিজ্ঞা করছি, তুই এবার খেয়ে নে। হা কর আমি খাইয়ে দিচ্ছি।” ঘুমের ঘোরে আহাদ সাহেব বিড়বিড় করে বলে যাচ্ছেন। অস্পষ্ট কথার শব্দে সালেহা বেগমের ঘুম ভেঙে যায়। পাশে স্বামীকে ঘামতে দেখে হাত দিয়ে ধাক্কা দেন। আহাদ সাহেব ধাক্কা খেয়ে “পুলিশ! আমি অন্যায় করিনি।” বলে লাফ দিয়ে বিছানায় ধপ করে উঠে বসেন।

নেয়াহয়েছেঃ Fb.com /https://www.facebook.com/groups/kobir.kolom/permalink/4204177582985978/

সমাপ্ত

০৫.০৮.২০২০