মৃৎশিল্পের দু-চার কিছু কথা। মৃৎশিল্প মানুষের প্রাচীনতম আবিষ্কারের একটি।

6

আচ্ছা,
প্রকৃতির সবচেয়ে সহজলভ্য উপাদান কী?
আমাদের প্রকৃতিতে কতশত উপাদান রয়েছে আমরা তার একটা ধারনা রাখি মাত্র, নির্দিষ্ট করে তা বলতে পারিনা।
প্রকৃতির সবচেয়ে সহজলভ্য উপাদান হচ্ছে মাটি।
হ্যাঁ, আমরা এখন মৃৎশিল্পের কথা বলবো।

মৃৎশিল্প কী?
বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও অন্যতম একটি শিল্প হচ্ছে মাটি দ্বারা তৈরি পাত্র, আসবাবপত্র এবং মূর্তি।
এই প্রাচীন শিল্পটি বাংলার ঐতিহ্য বহন করে আসছে বহুকাল ধরে।

মৃৎ এবং শিল্প এই দুটি শব্দ একত্রিত হয়ে গঠিত হয়েছে মৃৎশিল্প।
মৃৎ শব্দের অর্থ হলো “মাটি/মৃত্তিকা” আর শিল্প শব্দের অর্থ হলো “সুন্দর/নান্দনিক/সৃষ্টিশীল বস্তু”।
তাহলে মৃৎশিল্প হল, মাটি দিয়ে তৈরি সকল ধরনের শিল্পকার্য বা মাটি দিয়ে সুন্দর/ সৃষ্টিশীল বস্তু তৈরির প্রক্রিয়া হল মৃৎশিল্প।
খুব সহজ করে বললে বলা যায়, মাটির তৈরি শিল্পই মৃৎশিল্প।

বিদেশি ভাষায় মৃৎশিল্প!
মৃৎশিল্পের ইংরেজি প্রতিশব্দ হল Potter যার অর্থ “কাঁদা মাটি থেকে তৈরি যাবতীয় ব্যবহার্য ও সৌখিন শিল্প সামগ্রী”। আমরা এটাকে মৃৎশিল্প বললেও পৃথিবীর অন্যান্য স্থানে কাদামাটি প্রস্তুত ও পোড়ানো পাত্রকে ” সিরামিক(Ceramic)” বলে আখ্যায়িত করা হয়।
প্রাচীন গ্রীক শব্দ Karamas/Kerams শব্দ থেকে Ceramic শব্দ টি নেওয়া হয় যার অর্থ মৃৎশিল্পীর মাটি/Potter’s Earth। এই শব্দের সাথে জার্মান Karamic, ফরাসি Caramique এবং রুশ Keramika শব্দের মিল আছে।

মৃৎশিল্পের দু চার কথা!

সব কিছুর জন্যেই পূর্বপ্রস্তুতি লাগে। সব শিল্পেরই প্রধান কাঁচামাল এবং প্রসেসিং প্রক্রিয়া রয়েছে।
মৃৎশিল্প যেহেতু একটা শিল্প তাই এটিও বেশকিছু ধাপ অনুসরণ করেই চলে।

মৃৎশিল্পের কাঁচামাল মাটি অর্থাৎ এই শিল্পের জন্য অপরিহার্য উপাদান মাটি।
কোন মাটি?
আমরা জানি মাটি তিন প্রকার।
১- এটেল মাটি
২- দোয়াঁশ মাটি
৩- বেলে মাটি
আমাদের এই শিল্পের জন্য প্রয়োজন একটু কঠিন, পানি ধারন ক্ষমতা বেশি এবং আঠালো প্রকৃতির মাটি। উল্লেখিত গুনগুলি এটেল মাটিতে বিদ্যমান অর্থাৎ মৃৎশিল্পের জন্য এটেল মাটি ব্যবহৃত হয়।

মৃৎশিল্পের জন্য প্রথম যা করতে হয় তা হল মাটি সংগ্রহ। তারপর এটিকে ব্যবহারের উপযুক্ত করতে হয়( মাটি থেকে শক্ত সকল পদার্থ বা বস্তু বেছে ফেলতে হয়)।
তারপর একটা নির্দিষ্ট স্থানে তা রাখা হয় এবং এটিতে পানি মেশানো হয়। এভাবে চলে কাদা করার প্রক্রিয়া। মাটি এবং পানির মিশ্রণ টা এমন হয় যাতে এটি বেশি শক্ত না থাকে আবার বেশি নরমও না হয়।
নির্দিষ্ট আকার দেওয়ার আগে কাদামাটিকে চটকানো হয় যাতে একটি সুষম আদ্রতা বজায় থাকে। কাদামাটির বাতার বের করতে হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলে নিবর্তকরন।

মাটি প্রস্তুত হলে এবার তা নেওয়া হয় শিল্পের রুপ দিতে।
একটা নির্দিষ্ট সাথে একটা চাকতি থাকে (দেখতে অনেকটা গরুর গাড়ির চাকার মত ভারী এবং মোটা)।
এই চাকতির মাঝখানে মাটি রাখার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা আছে। এই চাকতি টা ঘুরাতে হয়। সাহায্য নিতে হয় একটা লাঠিরও। প্রথমে চাকতির মাঝখানে মাটি রেখে লাটি দিয়ে চাকতি ঘুরাতে হয়। খুব দ্রুত চাকতিটা ঘুরিয়ে এবার দৃষ্টি দিতে হয় মাটির দিকে। চাকতির সাথে মাটিও ঘুরছে প্রবল বেগে।
এবার মূল কাজ।
চাকতির মাঝখানে রাখা মাটিতে হাত পড়ে শিল্পির। হাতের স্পর্শে হালকা নরম মাটি এবার রুপ নিতে থাকে ভিন্ন ভিন্ন আকারে।
এখানে শিল্পি যেমন ইচ্ছে আকৃতি দান করছে মাটির। তৈরি হচ্ছে পাত্র, আসবাবপত্র আর মূর্তি।
কী সুনিপুণ হাতের ছোয়ায় চোখ ধাঁধানো শিল্প।

তারপর তাতে বিভিন্ন রেখা টানা যায়।
এবার রোদে শুকানোর পালা। কড়া রোদে শুকানো শেষ হলে তা এবার আগুনে পোড়ানোর জন্য প্রস্তুত।
ভাটায় জালানি সাজিয়ে তারপর শিল্পকর্ম গুলো সাজানো হয় একের পর এক। এবার আগুন দেওয়ার পালা। উচ্চ তাপমাত্রায় পোড়াতে হয়। তাপমাত্রা থাকতে হয় (৬০০°-১৬০০°) সেলসিয়াস। এতে বিক্রিয়া ঘটে বস্তুটির কাঠিন্য দৃঢ়তা বৃদ্ধি ও স্থায়ী পরিবর্তন করে।
রকমভেদে পোড়ানোর সময় আদালা হয়।
পোড়ানো শেষে তা বের করা হয়।
এবার আসে রং করার বিষয়।
ব্যবহৃত জিনিসে রঙের ব্যবহার তেমন না থাকলে চারুকলা অর্থাৎ সৌখিনতার বস্তু গুলোতে রং এবং চিত্রে বেশ বৈচিত্র্য লক্ষ্যনীয়।

মৃৎশিল্পের প্রকৃতি!
মৃৎশিল্প সাধারণত তিন ধরনের হয়ে থাকে। যেমন
মাটির পাত্র(Earthen Ware)
পাথুরে পাত্র(Stone Ware)
চিনামাটির পাত্র(Porcelain)
(ইসলামী শিল্পে fritware ব্যবহৃত হয়না সফে সেগুলো অন্তর্ভুক্ত না)
ঐতিহাসিকরা মৃৎশিল্পকে দু ভাবে ভাগ করে।
প্রথমটি হল “চারুকলামূলক মৃৎশিল্প” ( শৈল্পিক ধাঁচের, সাধারণত গৃহস্থালিতে ব্যবহৃত সৌন্দর্য বর্ধন করে)
দ্বিতীয়ত হল, “কারিগরি মৃৎশিল্প” (নকশা তেমন থাকেনা, গৃহস্থালিতে ব্যবহার্য)

কারা কাজটি করে?
যে পেশাজীবি সম্প্রদায় জড়িত অর্থাৎ
মৃৎশিল্প যাদের জীবিকার প্রধান তাদের বলা হয় কুম্ভকার/কুমার/কুমোর।
এরা পাল বংশের হয়ে থাকে। এরা এই কাজটা বংশপরম্পরায় করে থাকে।
এই সম্প্রদায় যেখানে বসবার করে অর্থা যে পাড়া বা মহল্লায় তা নামকরণ হয় কুমোরপাড়া/পালপাড়া।

মৃৎশিল্প মানুষের প্রাচীনতম আবিষ্কারের একটি। নব্যপ্রস্তরযুগে চেক প্রজাতন্ত্রের গ্র‍্যাভেতিয়ান সভ্যতার ডলনে ভোসনিসের খ্রিঃপূঃ ২৯০০০-২৫০০০ অব্দের ভেনাসের প্রস্তরমূর্তি আবিস্কার হয়েছে।
ধারনা করা হয় তার অনেক পূর্বেই প্রথম মানুষ তার পিপাসা থেকে মুক্তির জন্য পানি বহনের উপায় খুঁজতে থাকে এবং পানি বহনের প্রয়োজনীয়তা থেকেই মৃৎশিল্পের যাত্রা হয় এবং আজকের পর্যায়ে পৌঁছায়।

আমরা জানি, আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে মৃৎশিল্প শিল্প হিসেবে বিকাশ লাভ করেছে আমাদের বাংলায়। আমাদের নদীমাতৃক এই দেশে ভূতাত্ত্বিক গঠনে পলিমাটি একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। মৃৎপাত্র তৈরিতে প্রকৃতির এই সম্পদকে যথাযথ কাজে লাগিয়েছে এদেশের প্রাচীন অধিবাসীরা। কিন্তু আমার ভারি শিল্প নির্ভর জীবন, আধুনিকায়ন এবং কালের বিবর্তনে আমাদের ঐতিহ্যে ভরা এই শিল্প বিলিন হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

লিখাঃ আমিনুল ইসলাম
https://www.facebook.com/Aminulislam1744
ছবিঃ সংগৃহীত(News39.net)