জেনারেল হাফতারের ত্রিপলী অভিযান ব্যর্থ। লিবিয়ায় সমঝোতার সুযোগ কি নিকটবর্তী?

16

লিবিয়ার জাতিসংঘ সমর্থিত জিএনএ সরকার গতকাল রাজধানী ত্রিপলীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া রাজধানীর ৯০ কি.মি. দক্ষিণের জেনারেল হাফতারের ত্রিপলী যুদ্ধের প্রধান সাপ্লাই বেইজ তারহুনা শহরে এক প্রকার বিনা বাধায় জিএনএ সরকারের ফোর্স প্রবেশ করেছে। এই অবস্থায় জেনারেল হাফতারের ত্রিপলী দখল অভিযানের ব্যর্থতা লিবিয়ায় “রাজনৈতিক সমাধান” অনেকটা বাস্তব বিকল্প হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে।

ইতিমধ্যে জাতিসংঘ হতে জিএনএ এবং জেনারেল হাফতার উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের জন্য (৫+৫) মিলিটারি কমিটির আলোচনা শুরুর সম্মতি দিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। যদিও জিএনএ সরকার প্রথম থেকে আলোচনার জন্য জেনারেল হাফতারের বাহিনীকে গত ০৪ এপ্রিল ২০১৯ তারিখে শুরু করা ত্রিপলী অভিযানের পূর্ববর্তী অবস্থানে ফিরে যাওয়ার শর্ত দিয়ে আসছে। তবে এই শর্ত গত দুইমাস আগে জেনারেল হাফতারের কাছে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য ছিল, কিন্তু এটি এখন অনেকটা যৌক্তিক হয়ে উঠেছে।

কারণ গত ১৪ মাসের যুদ্ধে জিএনএ যে সকল শহর হারিয়েছিল, তার বেশিরভাগই বর্তমানে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। আর এই শহরগুলো জিএনএ-এর নিয়ন্ত্রণের জন্য লেগেছে ৭০ দিন। সাম্প্রতিক সময়ে লিবিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর সাবরাতা, সোরমান এবং কৌশলগত দিক দিয়ে গুরুত্বপপূর্ণ আল-ওয়াতিয়া এইয়ার বেইজ অনেকটা সহজে জিএনএ দখল করতে সক্ষম হয়েছে। আল-ওয়াতিয়া এয়ার বেইজ মূলত ২০১৪ সাল থেকেই জেনারেল হাফতারের অনুগত বাহিনীর দখলে ছিল। এছাড়া জেনারেল হাফতারের দ্বিতীয় প্রধান সাপ্লাই বেইজ গারিয়ান ইতিপূর্বে ত্রিপলীর সরকার দখল করেছিল।

আল-ওয়াতিয়া হারানোর পর জেনারেল হাফতারের মুখপাত্র ত্রিপলীর ফ্রন্ট লাইন থেকে তার বাহিনীকে বিভিন্ন জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। এরপর দক্ষিণ ত্রিপলী থেকে রাশিয়ার ভাড়াটে সৈন্য ওয়াগনার গ্রুপ চলে গেলে জেনারেল হাফতারের ত্রিপলীতে পরাজয় একপ্রকার অবশ্যম্ভাবী ছিল। এই অবস্থায় খুব অল্প সময়ের মধ্যেই জিএনএ সরকার ত্রিপলীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে তারহুনায়ও শান্তিপূর্ণভাবে প্রবেশ করেছে। অন্যদিকে তারহুনার পার্শ্ববর্তী বানি ওয়ালিদ ত্রিপলী যুদ্ধের শুরু থেকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেছে। ফলে বানি ওয়ালিদে কোন যুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই এবং তারা জিএনএ সরকারের অনুগত থাকবে।

এই অবস্থায় জেনারেল হাফতারের দখলে আছে শুধুমাত্র সিরত। কিন্তু আলোচনার শর্ত অনুযায়ী সিরত শহরও জিএনএ-এর কাছে হস্তান্তর করতে হতে পারে। এছাড়া মিসরাতা শহরকে পরিপূর্ণ সুরক্ষিত রাখতে সিরত দখলের বিকল্প নেই। অন্যদিকে লিবিয়ার সাবহাসহ দক্ষিণাঞ্চলের স্থানীয় বাহিনীগুলো সুযোগ বুঝে যেকোন একদিকে থাকবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে।

অথচ গত আগস্ট ২০১৯ সময় পর্যন্ত জেনারেল হাফতার ত্রিপলী দখলের দ্বারপ্রান্তে ছিল। তাকে গোপনে অস্ত্র সরবরাহসহ কূটনৈতিক সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছিল আমিরাত, মিসর, রাশিয়া, ফ্রান্স, জর্ডান এবং সৌদিয়া। অন্যদিকে জিএনএ-কে জাতিসংঘসহ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন নৈতিক সমর্থন দিলেও সরাসরি পাশে দাঁড়ানোর কেউ ছিলনা। এই অবস্থায় জিএনএ সরকার তুরস্কের সাথে দ্বিপাক্ষিক সামরিক সহযোগিতা সংক্রান্ত দুইটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। যা ত্রিপলী যুদ্ধের মূল টার্নিং পয়েন্ট হিসাবে বিবেচিত।

এরপর তুরস্ক অনেকটা ঘোষণা দিয়ে ত্রিপলী সরকারকে সামরিক সহযোগিতাসহ উন্নতমানের ড্রোন সাপ্লাই করলে যুদ্ধের পরিস্থিতি পাল্টে যায় এবং পুরো বিশ্ব নড়েচড়ে বসে। পরবর্তী সময়ে ত্রিপলীর যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি রাশিয়া ও তুরস্কের হাতে চলে যায় এবং দুই দেশের প্রেসিডেন্টের উদ্যোগে ১২ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে প্রথম যুদ্ধবিরতির ঘোষণা করা হয়। এরপর মস্কোতে যুদ্ধবিরতির চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা থাকলেও জেনারেল হাফতার চুক্তি স্বাক্ষর না করে চলে আসে। যদিও জিএনএ-এর প্রধানমন্ত্রী ফায়েজ আল-সাররাজ সেদিন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল।

এই অবস্থায় জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ১৯ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত হয় বার্লিন কনফারেন্স। যেখানে লিবিয়ায় প্রভাববিস্তারকারী ১২ টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান/ সরকার প্রধান/পররাষ্ট্রমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। এই কনফারেন্স থেকে সকল দেশ লিবিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপ না করা এবং লিবিয়ায় জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার অংগীকার করেন। এছাড়া জাতিসংঘের উদ্যোগে শান্তি আলোচনায় সকলে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

এই অবস্থায় জাতিসংঘের অধীনে লিবিয়ায় শান্তি আলোচনার জন্য মিলিটারি (৫+৫), রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কমিটির মধ্যে সংলাপ শুরু হয়। কিন্তু বাহিরের দেশের লিবিয়ায় হস্তক্ষেপ বন্ধ না হওয়ায় এই সকল আলোচনা ফলপ্রসূ হয়নি। বরং ত্রিপলীতে যুদ্ধের তীব্রতা আরো বাড়তে থাকে এবং এক পর্যায়ে জাতিসংঘের প্রতিনিধি ঘাসসান সালামে হতাশ হয়ে পদত্যাগ করেন। লিবিয়ার বিষয়ে জাতিসংঘের সিকিউরিটি কাউন্সিলে বিভক্তির কারণে এখন পর্যন্ত মহাসচিব নতুন কাউকে নিয়োগ দিতে পারেনি।

এই পরিস্থিতিতে ত্রিপলীতে জেনারেল হাফতারের পরাজয় এবং জিএনএ সরকার কর্তৃক তারহুনাসহ অন্যান্য পশ্চিমাঞ্চলীয় শহররের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় লিবিয়ার যুদ্ধে বর্তমানে একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এছাড়া লিবিয়ার যুদ্ধে রাশিয়া এবং তুরস্ক বর্তমানে এককভাবে সামনাসামনি অবস্থানে চলে এসেছে। এই দুই দেশের মধ্যে সিরিয়ার বিভিন্ন বিষয়সহ অনেক দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ থাকায় লিবিয়ার ক্ষেত্রে তারা একটা সমঝোতায় আসতে পারে বলে ধারণা করা যাচ্ছে।

যদিও রাশিয়া ১৪ টি যুদ্ধবিমান ইতিমধ্যে লিবিয়ায় স্থানান্তর করেছে বলে জানা গেছে। তবে লিবিয়াতে রাশিয়া ও তুরস্ক একটি সীমারেখা নির্ধারণ করতে পারে এবং জিএনএ সরকার হয়তো এরপর আর সামনে আগানোর চেষ্টা করবে না। সেক্ষত্রে সিরত শহর জিএনএ দখল করার সম্ভাবনা বেশি। তবে এই বিষয়টি নির্ভর করছে তুরস্ক ও রাশিয়ার সমঝোতার মধ্যে। অন্যদিকে তুরস্কের অনুগত বাহিনী লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলে ক্ষমতায় আসুক সেটা মিসর কোনভাবেই চাইবে না।

ত্রিপলীতে পরাজয়ের পর জেনারেল হাফতারের মুখপাত্র রাজনৈতিক সংলাপ শুরু করার নিদর্শন হিসাবে তারা ত্রিপলী থেকে তাদের বাহিনীকে সরিয়ে নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। এছাড়া জ